অনলাইন ডেস্কঃ
পেট্রোল দেশে উৎপাদিত হলেও এর কাঁচামাল (ক্রুড অয়েল) সম্পূর্ণ আমদানি নির্ভর। ফলে বৈশ্বিক সরবরাহে বিঘ্ন ঘটলে দেশীয় উৎপাদনও প্রভাবিত হয়, যার প্রভাব পড়ে সামগ্রিক জ্বালানি বাজারে।
কারণটা শুধু যুদ্ধ নয়। ফেব্রুয়ারির শেষ সপ্তাহে ইরানে হামলার পর হরমুজ প্রণালীতে অস্থিরতা, প্যানিক বায়িং ও অবৈধ মজুত - এই তিন কারণে ডিজেল ও অকটেনের সরবরাহে সাময়িক চাপ তৈরি হয়েছে। তবে বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম কর্পোরেশন (বি.পি.সি) নিশ্চিত করেছে, পেট্রোলের সরবরাহ সম্পূর্ণ স্বাভাবিক। নতুন চালান আসায় মে মাসের প্রথম সপ্তাহ নাগাদ পরিস্থিতি পুরোপুরি স্বাভাবিক হবে।
## বাস্তব চিত্র: পেট্রোল দেশেই উৎপাদন হয়, চাপ ডিজেল-অকটেনে
বি.পি.সি এর তথ্য অনুযায়ী, দেশের পেট্রোল চাহিদার ১০০ শতাংশই দেশে উৎপাদিত হয়। এর ১৬ শতাংশ আসে রাষ্ট্রায়ত্ত ইস্টার্ন রিফাইনারি লিমিটেড (ই.আর.এল) থেকে এবং বাকি ৮৪ শতাংশ সরবরাহ করে বেসরকারি খাতের ৪টি রিফাইনারি। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে ই.আর.এল মোট ৫৯,১৫০ টন পেট্রোল উৎপাদন করেছে। ৩ এপ্রিল পর্যন্ত বি.পি.সি এর মজুতে পেট্রোল ছিল ১২,৭৫৬ টন, যা ৯ দিনের চাহিদা মেটাতে পারে।
তবে পেট্রোল দেশে উৎপাদিত হলেও এর কাঁচামাল সম্পূর্ণ আমদানি নির্ভর হওয়ায় আন্তর্জাতিক সরবরাহ পরিস্থিতির প্রভাব থেকে বাজার পুরোপুরি মুক্ত নয়।
মূল সংকট ডিজেল ও অকটেনে। দেশের মোট জ্বালানি চাহিদা বছরে প্রায় ৭২ লাখ টন, যার ৯২ শতাংশ আমদানি করতে হয়।
## সংকটের 3টি মূল কারণ: আন্তর্জাতিক, মনস্তাত্ত্বিক ও ব্যবস্থাপনাগত
### প্রথম কারণ: হরমুজ প্রণালীতে সরবরাহ বিঘ্ন
বিশ্বের ২০ শতাংশ জ্বালানি তেল হরমুজ প্রণালী দিয়ে পরিবহন হয়। বাংলাদেশের এল.এন.জি আমদানির ৭১ শতাংশ ও ক্রুড অয়েলের ১০০ শতাংশ এই প্রণালী হয়ে আসে। ফেব্রুয়ারির শেষ সপ্তাহের হামলার পর রুট ঝুঁকিপূর্ণ হওয়ায় ই.আর.এল এর কাঁচামাল সরবরাহ বাধাগ্রস্ত হয়। ৭ এপ্রিল থেকে ই.আর.এল এ উৎপাদন সাময়িকভাবে স্থগিত আছে। সৌদিআরব থেকে ১ লাখ টন ক্রুড অয়েলের চালান এপ্রিলের শেষ সপ্তাহে পৌঁছানোর শিডিউল রয়েছে।
### দ্বিতীয় কারণ: প্যানিক বায়িং ও গুজব
২ এপ্রিল দৈনিক ডিজেল বিক্রি হয়েছে ১২,২৪৮ টন ও অকটেন ১,২২২ টন, যা গড়ের চেয়ে বেশি। অর্থাৎ সরবরাহ কমেনি, বরং বেড়েছে। তবুও পাম্পে চাপের কারণ ভোক্তা পর্যায়ে চাহিদার আকস্মিক বৃদ্ধি। দেড় দিনের স্টক ২ ঘণ্টায় শেষ হয়ে যাচ্ছে।
### তৃতীয় কারণ: অবৈধ মজুত ও বণ্টন চ্যালেঞ্জ*
মার্চ থেকে ১৪ এপ্রিল পর্যন্ত সারা দেশে ৯১৬টি মোবাইল কোর্ট পরিচালনা করে ৫,৪২,২৩৬ লিটার জ্বালানি জব্দ করা হয়েছে। চট্টগ্রামে কর্ণফুলী নদী থেকে ৩৭,০০০ লিটার অবৈধ ডিজেলসহ একটি ট্যাংকার আটক করা হয়েছে।
স্থানীয় পর্যায়েও বণ্টনকালে শৃঙ্খলা রক্ষায় প্রশাসন তৎপর। অফিসার ইনচার্জ, সরিষাবাড়ী থানার মোঃ ইকবাল হোসেন জানান, "সরিষাবাড়ীর ঝিনাই ফিলিং স্টেশনে পেট্রোল সরবরাহের সময় কিছুটা অগোছালো পরিস্থিতি তৈরি হলে সংবাদ পেয়ে আমি আমার ফোর্স নিয়ে দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে সক্ষম হয়েছি।"
বাংলাদেশ ওয়াটার ট্রান্সপোর্ট কো-অর্ডিনেশন সেল (BWTCC) জানিয়েছে, বণ্টন জটে লাইটার ভেসেলগুলো পণ্য খালাস করতে পারছে না।
## সরকারি পদক্ষেপ ও সমাধানের পথ
সরবরাহ স্বাভাবিক রাখতে সরকার ১৬ লাখ টন ডিজেল ও ১ লাখ টন অকটেন আমদানির অনুমোদন দিয়েছে। ৯ এপ্রিল ২৬,০০০ টন অকটেন নিয়ে জাহাজ চট্টগ্রাম বন্দরে ভিড়েছে। এপ্রিল মাসে জ্বালানি তেলের দাম অপরিবর্তিত: ডিজেল ১০০ টাকা, অকটেন ১২০ টাকা, পেট্রোল ১১৬ টাকা লিটার।
দীর্ঘমেয়াদে ই.আর.এল-২ প্রকল্পে ৩৫,৪৬৫ কোটি টাকা অনুমোদন করা হয়েছে। এটি চালু হলে পরিশোধন ক্ষমতা ১৫ লাখ টন থেকে ৪৫ লাখ টনে উন্নীত হবে।
জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগের অনুরোধ:
গুজবে কান দিয়ে অতিরিক্ত জ্বালানি ক্রয় থেকে বিরত থাকুন। প্রয়োজনের অতিরিক্ত মজুত করলে কৃত্রিম সংকট তৈরি হয়। মে মাসের প্রথম সপ্তাহ নাগাদ পরিস্থিতি স্বাভাবিক হবে বলে বিভাগ আশা করছে।
